ষড়যন্ত্রের শুরু সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই । মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নস্যাত করার জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক যে গভীর ষড়যন্ত্র দানা বেধেছিল তা সফল হতে পারেনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের (প্রবাসী সরকার) এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তায়। বিজয়ের ঠিক দ্বারপ্রান্তে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কতিপয় সেনা সদস্য “সেনা পরিষদ” গঠন করে গোপনে মিলিত হয়ে শপথ গ্রহণ করে যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, আওয়ামী লীগ সরকারের দক্ষ পরিচালনায় এবং ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দেশ স্বাধীন হলেও এই সেনা পরিষদ তা মেনে নেবে না; বরং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করে প্রো-পাকিস্তানপন্থী একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। তার আলামত শুরু হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভের পর থেকেই। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে দেশে পাঠানোর প্রাক্কালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ৭ জানুয়ারি ,১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ডিনারের আয়োজন করেন । খাওয়ার টেবিলে যাওয়ার সময় এক ফাঁকে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বললেন , “পাকিস্তান তো আপনারাই বানিয়েছেন । আমি তখন ছাত্র

ছিলাম । যা হয়েছে দু:খজনক । কনফেডারেশনের মাধ্যমে কিছু একটা লিংক রাখা যায় কিনা! “ বঙ্গবন্ধু প্রতি উত্তরে বললেন , “আমি তোমার প্রশ্ন শুনলাম , এর উত্তর আমি ঢাকায় নেমে সঙ্গে সঙ্গে জানাব।“ ভুট্টো বললেন , “আজ না পাঠিয়ে কালকে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চাই । কারণ কালকে ইরানের শাহ আসবেন এবং আপনার সাথে দেখা করবেন।“ বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন ,ইরানের শাহকে দিয়ে একটা সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছেন ভুট্টো । সেই জন্যই তেহরান হয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন । এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বঙ্গবন্ধু উত্তেজিত কন্ঠে বললেন , “আমার এই সব ভালো লাগছে না । আমরা ডিনার করব না । আজকে রাতের মধ্যে যদি পাঠানোর ব্যবস্থা কর তাহলে যেতে পরি । তা না হলে তুমি আমাকে কারাগারে পাঠাও।“ অবস্থা বেগতিক দেখে ভুট্টো সঙ্গে সঙ্গে সেক্রেটারিকে ডেকে বললেন , “প্লেন আনার ব্যবস্থা কর।“ করাচি থেকে প্লেন আসতে দুই ঘণ্টা সময় লাগবে । এই কথা শোনার পর বঙ্গবন্ধু ডিনার খেতে রাজি হলেন । অবশেষে ভুট্টো নিজে বিমানবন্দরে এসে বঙ্গবন্ধুকে বিদায় জানান । কিন্তু ষড়যন্ত্র…

মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর। এই আঘাত ছিল পরিকল্পিত। একাত্তরকে মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র — এবং তা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়-এখনও চলছে। প্রতিরোধ ছাড়া কোন বিকল্প নেই। প্রতিরোধ চেতনা দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, ও এই ধারাবাহিকতায় "বাংলাদেশ সনদ" একটি বৌদ্ধিক আন্দোলন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। জাতীয়তাবাদ বিষয়ে সনদের অঙ্গীকার এই যে - "বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক জাতীয়তাবাদ, যা এই ভূখণ্ডের সকল মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্রকে পূর্ণ মর্যাদায় ধারণ করে — যা আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তি — যা গণহত্যাসহ অতীতের সকল বঞ্চনা ও অবিচারের অভিজ্ঞতাকে মনে রেখে জাতীয় সংহতি ও জাতি গঠনে পথ দেখাবে।"

বাঙালির ইতিহাস যেমন পুরোনো, তেমনি গৌরবোজ্জ্বল। বাংলায় মানব বসতির সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে কমপক্ষে দশ হাজার বছর পূর্বে। বাঙালি জাতির দৈহিক বৈশিষ্ট্য ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাঙালির উৎস নিয়ে নানাবিধ মতবাদ থাকলেও অনেকের মতে, বাঙালির আদি জনগোষ্ঠী অস্ট্রো-এশিয়াটিক বা অস্ট্রিক জাতিভুক্ত। আর্যপূর্ব যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত আজকের এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে আসতে বাঙালিকে অসংখ্য চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে। আর্যদের ভারতবর্ষে আগমন ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ বছরের কাছাকাছি। নানাবিধ কারণে বাংলার অধিবাসীদের সাথে আর্যদের কোন নৃতাত্ত্বিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি।  গ্রীক বীর আলেকজান্ডার খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে (খ্রি. পূ. ৩২৭ অব্দে) ভারতবর্ষে এসে উত্তর ভারতের বিপাশা নদ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলা দখল করতে সাহস দেখাননি। প্রসঙ্গত, পন্ডিত ডিওডোরাস প্রাচীন বাংলার শক্তিশালী রাজ্যের পরিচয় দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন: "ভারতবর্ষে বহুজাতির বাস। তন্মধ্যে গঙ্গারিড্ডির জাতি সর্বশ্রেষ্ঠ। ইহাদের চারি সহস্র বৃহত্কায় সুসজ্জিত রণহস্তী আছে। এই জন্য অপর কোন রাজা এই দেশ জয় করিতে পারে নাই। স্বয়ং আলেকজান্ডারও এই সমুদয় হস্তীর বিবরণ শুনিয়া এই জাতিকে পরাস্ত করিবার দুরাশা ত্যাগ করেন।" আলেকজান্ডারের প্রস্থানের পর থেকে ব্রিটিশ শাসনের অবসান পর্যন্ত

দুই হাজার বছরের ইতিহাসে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, পাঠান, মোগল, ইংরেজ প্রভৃতি জাতি বাংলা শাসন করেছে। মজার ব্যাপার হল, এই সময়ে বাঙালিরাও বাংলাকে শাসন করেছে। কিংবদন্তি অনুসারে বা কিছু মতবাদ অনুযায়ী, রাজা নন্দ বাঙালি ছিলেন।অনেকের ধারণা, গুপ্তগণও বাঙালি ছিলেন। শশাঙ্ক এবং পালগণ নিশ্চিতভাবেই বাঙালি ছিলেন। কিন্তু কেউই বাঙালিকে স্বাধীন বা সার্বভৌম রাখার চিন্তা করেননি — বা করার সুযোগ পাননি। এর নানাবিধ কারণের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবোধ জাগ্রত না হওয়াও অন্যতম প্রধান কারণ। বাঙালির সেই জাতীয়তাবোধ কিন্তু একদিনে জাগ্রত হয়নি। বাঙালির আদি থেকে আজতক সাহিত্য মানুষের যে দুঃখ ও সুখ চিত্রায়ণ ঘটেছে - তার একটা ব্যাপক পরিমণ্ডলে এই যুক্তি অহরহ দেখা যায় যে, তার স্থানিক ও এথনিক দুই পরিচয় মিলে এই জনপদ নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছে। তার ভাষা যেমন আদৃত হয়েছে তেমনি তার এথনিক বৈচিত্র্য ও মিলিত বৈশিষ্ট্য বহিরাগতদের কাছে অপমানেরও শিকার হয়েছে। আঠারো-উনিশ শতকের সাহিত্য ও দলিলাদি, উদাহরণস্বরূপ, বঙ্কিমের 'আনন্দমঠ' থেকে রবীন্দ্রনাথের 'আমার সোনার বাংলা' — যাবতীয় সাহিত্য ও সাহিত্য নয় এমন দলিল-দস্তাবেজ পড়লে এ উপলব্দি হয় । ১৯০৫ সালের আগে ইংরেজী…

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চার মূল স্তম্ভের একটি হচ্ছে ধর্ম নিরপেক্ষতা। এই “নিরপেক্ষতা” নিয়ে কয়েকটি ভুল ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে গত ৫৪ বছরে। এগুলো মোটা দাগে পাঁচ প্রকার: ১) ধর্ম নিরপেক্ষতা বলতে ধর্ম নিয়ে ব্যবসায় করা একটি পক্ষ সবসময় এটাকে ধর্মহীনতা বলতে চেয়েছে, এবং আওয়ামী লীগকে নাস্তিকদের দল হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ২) ধর্মের গুরুত্ব বুঝতে সচরাচর বাংলাদেশকে ৯০ কিংবা ৯৫% মুসলমানের দেশ বলে অন্য ধর্মের লোক বিশেষ করে হিন্দুদের উপর একটা মানসিক চাপ তৈরি করা হয়েছে। এর পিছনে রয়েছে সেই একই পাকিস্তান-পন্থী উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী। ৩) ধর্মকে ব্যবহার করে মসজিদ মাদ্রাসার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, হজ্জের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য সহ তুর্কি এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে “আদম” ব্যবসার রাস্তা তৈরি, যাকাত-সদকার টাকা নিজেদের মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যে ভাগ করা এবং বিদেশে পাচার করা, এবং ইসলামিক ব্যাঙ্কিং এর মাধ্যমে নিজেদের মতাদর্শের লোকদের ব্যবসায় কার্যক্রম প্রসারিত করেছে জামাতে ইসলামি এবং সমমনা ধর্ম-ভিত্তিক দল। ৪) ইসলাম ধর্ম থেকে আলাদা করার জন্যই হিন্দু-প্রধান দেশ ভারত বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হতে সাহায্য করেছে। ৫) নারীর কাজ ঘরের মধ্যে। সামাজিক কাজে নারীর অংশগ্রহণের

কোনো সুযোগ নেই। নারী নেতৃত্ব ততক্ষণই ভালো যতক্ষণ এটাকে ব্যবহার করে (রাজনৈতিক) ফায়দা আদায় করা যায়। ধর্মের ব্যবহার করেই ৭৫ পরবর্তী সময়ে দেশের সংবিধানে সংযোজন এবং ধর্ম-ভিত্তিক দলগুলোকে “রাষ্ট্রদ্রোহিতা” সত্ত্বেও বাংলাদেশে রাজনীতির অনুমতি দেয়া হয়। সাথে সাথে আওয়ামী লীগকে শুধু ইসলাম ধর্মবিরোধীই না, বরং সকল ধর্মের বিপক্ষে একটা নাস্তিক শক্তি হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ এই আওয়ামী লীগ ধর্মীয় নিপরপেক্ষতা পুরোপুরি ধরে রাখতে না পারলেও, বাংলাদেশী মুসলমানদের উপকারে সবচেয়ে বেশি প্রকল্প সম্পন্ন করেছে। নারীর ক্ষমতায়নে সবচেয়ে বেশি কাজ করা শেখ হাসিনাকে জুলাইয়ের রেজিম পরিবর্তনে নারী বিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আসুন কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করি। (সব ভুল আমার। কোনো তথ্য সংযোজন করা দরকার মনে করলে আমাকে পাঠাবেন। ইচ্ছা করেই ৫০০ এর অধিক মসজিদ প্রকল্পের তথ্য সংযোজন করা হয়নি।) আওয়ামী লীগ নিজেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নীতি নির্ধারণে তারা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান দেওয়া এবং নারীর অধিকার ও শিক্ষায় প্রগতিশীল সংস্কার – এই দুয়ের মধ্যে এক জটিল ভারসাম্য বজায় রাখে। ১. বঙ্গবন্ধু…

বাংলাদেশে সদ্য জনপরিসরে উন্মোচিত “বাংলাদেশ সনদ” আন্দোলনের অঙ্গীকারনামায় “সমাজতন্ত্র” শব্দটির অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এতদিন বিতর্ক জারী ছিল, এখন আচমকা বিজ্ঞ জনসমাজ সমাজতন্ত্র বিষয়ে উদ্যোক্তাদের নিয়ত কি সে প্রশ্ন করছেন । কেউ এটিকে আকস্মিক বিয়োজন ধরে নিয়েছেন। কেউ আবার এটির অনুল্লেখ আদর্শিক বিচ্যুতি বলেও মনে করছেন। যা স্বাভাবিক। কিন্তু এই অনুল্লেখ একটি বড়ো কাজ করে ফেলেছে। আচমকা জনপরিসরে চলমান মুমূর্ষু গণতন্ত্রকে নিয়ে ভাবছে না, তার চেয়ে বেশি ”সমাজতন্ত্র” ধারণাটি নিয়ে মানুষ নাড়াচাড়া শুরু করেছে। https://www.bangladeshcharter.org/our-journey/ এ প্রসঙ্গে বাংলার গত শতাব্দীর ইতিহাস নিয়েও একটু নাড়াচাড়া করা যাক। কি বলেন? ইতিহাস কি জানায় আমাদের? ইতিহাসের তথ্য উপাত্ত জানায় যে—সমাজতন্ত্র এই বাংলায় হঠাৎ নাজেল হওয়া কোনো চেতনা নয়। এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, শ্রেণীগত বাস্তবতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা এক চেতনা, যা বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম একটি মূলনীতি। ভুললে চলবে না যে, অর্থনৈতিক বৈষম্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যূদয়ের অন্যতম কারণ।১৯৬০-এর দশকের পূর্ব-পাকিস্তান ছিল গভীরভাবে অসাম্য চর্চার এক রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রের সমাজ ছিল আশরাফ-আতরাফ, উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণ, এ জাতীয় নানা স্তরে বিভক্ত। এর মধ্যে

জনসাধারণের বিপুল অংশ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন কৃষিসমাজের জনগণ। আশরাফ মুসলমান চালিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় মদদে গভীর থেকে গভীরতর করে তোলা অসাম্যের ছোবলে সমাজ ক্ষত-বিক্ষত ছিল। একদিকে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও পুঁজি সঞ্চিত হচ্ছিল। পুঁজি আসতো পূর্বাঞ্চল থেকে। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চল, অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব-বাংলার কৃষক, শ্রমিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর কাঠামোগত বঞ্চনা ক্রমে তীব্র হয়ে উঠছিল। পাট, কৃষি ও শ্রমশক্তি থেকে উৎপন্ন সম্পদ চলে যেত কেন্দ্রের ( পশ্চিমাঞ্চলের) দিকে। কিন্তু বিনিয়োগ ও উন্নয়ন আসতো না পূর্ব-বাংলায়। এই বাস্তবতায় “শ্রেণী” কোনো তাত্ত্বিক শব্দ ছিল না—এটি ছিল বাংলার জনগণের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি এই প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের হাল ধরে ছিলেন যে নেতৃত্ব, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলায় যিনি স্বদেশের জনগণের ”বঙ্গবন্ধু” ডাকের ভেতর দিয়ে বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তার দলীয় ৬ দফা কেবলমাত্র সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না। এর ভেতরে ছিল অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের দাবি। রাজস্ব, মুদ্রানীতি, বাণিজ্য—সবকিছুর ওপর আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। অর্থাৎ, এক ধরণের অর্থনৈতিক মুক্তির রূপরেখা তিনি ভেবেছেন, যা সরাসরি…

ফেব্রুয়ারী ২০২৬ এর গণভোট অত্যন্ত অনিশ্চিত অবস্থা তৈরী করেছে এবং এ আয়োজনের পেছনে রয়েছে জুলাই সনদ ও ১৯৭১-এর মহতী জনযুদ্ধ থেকে জাত বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র বিরোধী গোষ্ঠীসমূহের আগামী পরিকল্পনা। রাষ্ট্রের কাঠামো বদলানো, রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক দিক নির্ধারণ করা বা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া সাধারণত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যান্ডেটের মধ্যে পড়ে না। গণভোটের মাধ্যমে এ জাতীয় বড় ধরণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার নিতে যাচ্ছে জামায়াত ও তার নিয়োগপ্রাপ্ত মুহাম্মদ ইউনুস। এ ধরণের পদক্ষেপ গৃহীত হবে সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করে। বিশ্বের উদাহরণ থেকে বলা যায়, এ ধরণের আয়োজন সরকারের ও রাষ্ট্রের জন্য এক বা একাধিক ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষ করে যখন সংসদ অনুপস্থিত বা দূর্বল থাকে (বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৭ ও ১১)। ঠিক এই সীমাটিই অতিক্রম করেছে মুহাম্মদ ইউনুস ও তার পাপেট সরকার। গণভোটে হাঁ দেয়ার অর্থ সাংবিধানিক সীমা অতিক্রমে তার অনৈতিক ও বেআইনী পদক্ষেপগুলোকে দায়মুক্তি দেয়ার সুযোগ। তা এক কূ-দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। এ সরকারকে এসব পদক্ষেপগ্রহণে ছাড় দেয়ার মানে, এরপর যে কেউ তার একক সিদ্ধান্তে সংবিধান, রাষ্ট্র ও দেশ নিয়ে ’যা খুশী, তাই’ করতে পারবে। রাষ্ট্রবিরোধী চক্র দেশের সার্বভৌমত্ব বিলিয়ে দিতে পারবে, গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধান ধ্বংসের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-কাঠামোর মৌলিক চরিত্র সম্পূর্ণ পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ কি এ ঝুঁকি নিতে চায়?  

বাংলাদেশ পর্ব এক. বাংলাদেশে এখন “গণভোট” শব্দটি শুনতে কারু কারু কাছে আকর্ষণীয় বোধ হতে পারে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা, চরম অবিশ্বাস, মাসের পর মাস ক্রমাবনতির দিকে যেতে থাকা অর্থনৈতিক অচলাবস্থা এবং কষ্ট-ক্লান্তির মধ্যে গণভোটকে কেউ কেউ হয়তো এক ধরণের শর্টকাট সমাধান হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এ ভাবনাটি ভুল। এই মুহূর্তে গণভোট সমস্যার সমাধান নয়, সমস্যাকে আরো জটিল ও ঘণীভূত করার পায়তাড়া। এ কথা গণ্য—গণভোট গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। কিন্তু সব গণতান্ত্রিক পদ্ধতি সব পরিস্থিতিতে কার্যকর হয় না। ইতিহাস বলছে, বিভক্ত সমাজে, দুর্বল প্রতিষ্ঠানে, আর অনির্বাচিত শাসনের অধীনে গণভোট প্রায়ই নতুন সংকট তৈরি করে (IDEA, 2022)। বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারীতে যে “গণভোট“ সংঘটনের তোড়জোড় চলছে, তা ভালো না খারাপ সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় দেশের বিরাজমান বাস্তবতায় গণভোট একটি Worst case Scenario. গণভোটের প্রয়োজনীয়তা ও গণভোটের কার্যকারিতা, যে বিষয়েই কথা বলুন না কেন, প্রেক্ষাপটই সবকিছু নির্ধারণ করে। দুই. কীভাবে এটি Worst case Scenario? পাঁচটি দিক থেকে বিচার করা যায় যে আগামী গণভোট গোটা দুনিয়ার গণভোটের ইতিহাস বিচারে একটি মন্দতম পদক্ষেপ। শুরু করা যাক এই মৌলিক প্রশ্ন

দিয়ে—কে গণভোট আয়োজন করছে , কোন ক্ষমতাবলে এবং জনগণের সাথে তার কি সম্পর্ক? গণভোট আয়োজন করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার এক ধরণের ট্রানজিশনাল বা ক্ষমতার পালাবদলকালের সহায়ক সরকার। এ সরকারের মূল দায়িত্ব হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা, ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরী করা যেখানে সব দল অংশগ্রহণ করে নির্বাচন সুসম্পন্ন করতে পারে। অন্য কথায়, এ সরকার মাঠ তৈরী করবে, সব খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে, সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং নিরপেক্ষ থাকবে। রাষ্ট্রের কাঠামো বদলানো, রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক দিক নির্ধারণ করা বা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যান্ডেটের মধ্যে পড়ে না। গণভোটের মাধ্যমে বড় ধরণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটি সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করে। এটা সরকারের ও রাষ্ট্রের জন্য এক বা একাধিক ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষ করে যখন সংসদ অনুপস্থিত বা দূর্বল থাকে (বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৭ ও ১১)। ঠিক এই সীমাটিই অতিক্রম করেছেন মুহাম্মদ ইউনুস ও তার পাপেট সরকার। গণভোটে হাঁ দেয়ার অর্থ সাংবিধানিক সীমা অতিক্রমে তার অনৈতিক ও বেআইনী পদক্ষেপগুলোকে দায়মুক্তি দেয়া।…

  • Sign up
Password Strength Very Weak
Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
We do not share your personal details with anyone.